রেজি: নং - আবেদিত                                                                                        শনিবার,  ১৫ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং,  ১লা পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ,  রাত ১২:২৪

“আনোয়ার হোসেনের মৃত্যুতে শরীয়তপুরে শোকের ছায়া”

December 2, 2018 , 2:42 pm

কারো কাছে আনোয়ার ভাই, কারো কাছে ক্যামেরার দাদু, কারো কাছে আনোয়ার আংকেল, কেউ চিনতো বুড়া ক্যামেরাম্যান হিসেবে। আনোয়ার হোসেন ২০১৩ এবং ২০১৪ সালে শরীয়তপুর একটি সরকারী অনুদানের ছবি “অপেক্ষা”র চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। চলচিত্রের পরিচালক সারওয়ার জাহান খান-এর বাড়ী শরীয়তপুর হওয়ায় ছবির সমস্ত  চিত্রায়ন শরীয়তপুরে হয়েছিলো। কাজের জন্য সারওয়ার জাহান খান এর সাথে শরীয়তপুর আসার পর আনোয়ার ভাইকে শরীয়তপুরবাসী আপন করে নেয়। তাছাড়া ঐ চলচিত্রে এড. মুরাদ হোসেন মুন্সী কাজ করার কারণে তখনই আনোয়ার ভাই সিদ্ধান্ত নেয় যে, বাকী জীবন তিনি শরীয়তপুরে বসবাস করবেন। কারণ, শরীয়তপুরের প্রকৃতি, মানুষ, নদী এবং আধুনিক সুবিধাদী সব মিলিয়ে বসবাসের জন্য ভাল শহর মনে হয়েছে আনোয়ার ভাইয়ের কাছে। সেই থেকে প্রায় ৫ বছর যাবৎ তিনি শরীয়তপুরের তার প্রথম ছাত্র এড. মুরাদ হোসেন মুন্সীর মাধ্যমে বসবাস করতেন। সকালে বের হয়ে সারাদিন ঘুরে ঘুরে শরীয়তপুর জেলা বিভিন্ন স্থানে ছবি তুলতে গিয়ে তিনি শিশু থেকে বৃদ্ধা সকলের প্রিয় মানুষ হয়ে ওঠেন। তিনি শরীয়তপুরের বিভিন্ন শিক্ষার্থীকে ফটোগ্রাফীর উপর প্রশিক্ষণও করান। এক কথায় শরীয়তপুরের রিক্সওয়ালা, ভ্যান ওয়ালা, দোকানদার থেকে শুরু করে প্রশাসনের সকল পর্যায়ের সকলের প্রিয় মানুষ ছিলেন। শরীয়তপুরের শিল্প ও সাহিত্য অংগনে ছিল তার উপস্থিতি স্বরণে রাখার মতো। গত কাল হঠাৎ তার মৃত্যুর খবর টেলিভিশনে দেখে শরীয়তপুরে শোকের ছায়া নেমে আসে। তার মৃত্যুর সংবাদ শুনে অনেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। গতকাল তার শরীয়তপুরে আসার কথা ছিল। শরীয়তপুরে অনুষ্ঠিতব্য রথীন্দ্র-হালিম লোক উৎসবে তার সরব উপস্থিত থাকার কথা ছিলো। শেরেবাংলা নগর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ জানান, শনিবার সকালে পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনের একটি কক্ষের দরজা ভেঙে আনোয়ার হোসেনের মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তবে ৭০ বছর বয়সী এই আলোকচিত্রীর মৃত্যু কীভাবে হয়েছে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ তা নিশ্চিত করতে পারেনি। সূর্যদিঘল বাড়ী, এমিলির গোয়েন্দা বাহিনী, লালসালু ও অন্যজীবন সিনেমার চিত্রগ্রাহক আনোয়ার হোসেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন পাঁচবার। বলা হয়, বাংলাদেশের আলোকচিত্রীদের পুরো একটি প্রজন্মকে নতুন পথের দিশা দিয়েছে তার কাজ। দুই যুগের বেশি সময় ফ্রান্সে বসবাসকারী আনোয়ার হোসেন সে দেশের পাসপোর্ট নিলেও বছর দুই আগে দেশে ফিরে শরীয়তপুরে থাকতে শুরু করেন। একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত ২৮ নভেম্বর ঢাকায় এসে হোটেল ওলিওতে উঠেছিলেন তিনি। ঢাকার অনুষ্ঠান শেষে শরীয়তপুরের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য আসতো বলে তার শুভাকাঙ্খিদের কাছ থেকে জানাযায়। দৃকের জেনারেল ম্যানেজার এএসএম রেজাউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ওই অনুষ্ঠানের জন্য সকালে দুজন লোক আনোয়ার হোসেনের হোটেল কক্ষে গিয়ে দরজা বন্ধ পান। অনেক ডাকাডাকির পরও তিনি দরজা না খোলায় হোটেল কর্তৃপক্ষকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে দরজা ভেঙে ভেতরে আনোয়ার হোসেনকে মৃত অবস্থায় পায়। শেরেবাংলা নগর থানার উপ পরিদর্শক তোফাজ্জল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, “আনোয়ার হোসেন ছিলেন হোটেলের ৮০৯ নম্বর কক্ষে। সেখানে বিছার ওপর তার মৃতদেহ ছিল।” ১৯৪৮ সালের ৬ অক্টোবর পুরান ঢাকার আগানবাব দেউড়িতে আনোয়ার হোসেনের জন্ম। বাবা সিনেমার অফিসে কাজ করতেন বলে শৈশবেই রুপালি জগতের সঙ্গে তার পরিচয়। তখনই ছবি আকার শুরু। আর কলেজে উঠে স্কলারশিপের টাকা দিয়ে ৩০ টাকায় এক বন্ধুর কাছ থেকে আগফা ক্যামেরা কেনার ছবি তোলা শুরু করেন আনোয়ার। নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে আনোয়ার হোসেন ভর্তি হন বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগে। ১৯৭৪ সালে স্কলারশিপ নিয়ে সিনেমাটোগ্রাফির ওপর ডিপ্লোমা করতে যান ভারতের পুনে ফিল্ম ইনস্টিটিউটে। সেখানে বিখ্যাত জাপানি নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়ার সঙ্গে তার আলাপ হয়। পুনে থেকে ফিরে মসিউদ্দিন শাকেরের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ আর বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ চলচ্চিত্রে কাজ শুরু করেন আনোয়ার হোসেন। সেই সময় পরিচয় হয় অভিনেত্রী ডলি আনোয়ারের সঙ্গে। ১৯৭৯ সালে বিয়ে হয় তাদের। ১৯৯১ সাথে ডলি আনোয়ারের মৃত্যুর পর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ড ঘুরে প্যারিসে বসবাস শুরু করেন আনোয়ার। ১৯৯৬ সালে ফরাসি নাগরিক মরিয়মকে বিয়ে করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাপানের আশাহি পেইন্টিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়া আনোয়ার হোসেন ১৯৭৮ সালে কানাডায় কমনওলেথ আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ছয়টি মেডেল জয় করেন। এরপর চার দশকে ৬০টির মত আন্তর্জাতিক পুরস্কার জমে এই আলোকচিত্রীর ঝুলিতে। আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন আলোকচিত্রী ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্ত চিত্রগাহক আনোয়ার হোসেন আনু’র মৃত্যুতে জাতি এক গুণি শিল্পীকে হারালো।
রাজধানীর পান্থপথে হোটেল ওলিও’র একটি কক্ষে শনিবার সকালে খ্যাতি সম্পন্ন আলোকচিত্রীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনি কিছুদিন আগেই ফ্রান্স থেকে দেশে এসেছেন। শেরেবাংলা থানার এএসআই তপনকুমার সরকার জানান, গত ২৮ নভেম্বর তিনি হোটেল ওলিও’র ৮০৯ নম্বর কক্ষে উঠেন।শনিবার তাকে তার হোটেল কক্ষে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। সুরতহাল শেষে তার লাশ ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হবে। পুলিশের ধারনা তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আনোয়ার হোসেন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকমানের একজন আলোকচিত্রী। তিনি ১৯৪৮ সালের ৬ অক্টোবর ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন।১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে মাত্র দুই ডলার ( ৩০ টাকা) দিয়ে কেনা প্রথম ক্যামেরা দিয়ে তার আলোকচিত্রী জীবনের শুরু। পরবর্তিতে ২০ বছর আলোকচিত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশকে আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন।সূর্যদীঘল বাড়ি (১৯৭৯), এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী (১৯৮০), পুরস্কার (১৯৮৩), অন্য জীবন (১৯৯৫) ও লালসালু (২০০১) সিনেমায় শ্রেষ্ট চিত্রগ্রাহক হিসেবে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছেন।

Total View: 14

    আপনার মন্তব্য


[fbcomments]