রেজি: নং - আবেদিত, প্রতিষ্ঠাকাল: ১মার্চ ২০১৪                                                    শনিবার,  ৩০শে মে, ২০২০ ইং,  ১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  রাত ২:০০

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমীপে অবসর প্রাপ্ত শিক্ষিকা আতিকা বেগম রাশির খোলা চিঠি।

April 19, 2020 , 12:54 pm

প্রতিবেদকঃসুপ্তা চৌধুরী
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সমীপে রাজবাড়ীর টাউন মক্তব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসর প্রাপ্ত শিক্ষিকা তার নিজ সামাজিক গণ যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক আইডিতে বর্তমান প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রীর নিকটে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছেন।যা হুবহু তুলে ধরা হলো।যদি তার আকুতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিতে পরে সেই আশায়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি রাজবাড়ি জেলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র একজন মানুষ । আপনার এবং আমাদের বঙ্গবন্ধুর একজন অচেনা শুভাকাঙ্খী আমি। বহু ঝড় ঝঞ্ঝার মাঝেও আমার আদর্শ থেকে বিচ্যুত হইনি কখনো। আপনার নিকট আমার ব্যক্তিগত চাওয়া- পাওয়া নেই,আশাও করিনা। শুধু চাই আপনি এবং এই দেশ ভালো থাকুক। বলতে পারেন আমি আপনার একজন একনিষ্ঠ নীরব সমর্থক। প্রতি মুহূর্তে আপনার জন্য দোয়া করি। আমার এই ভালোবাসা আমৃত্যু বহন করব আমি। আমার এইসব কথা বলার ধৃষ্টতাকে ক্ষমা করবেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত রাজবাড়ীর কর্তা ব্যক্তিদের সাথে আপনার ভিডিও কনফারেন্সে পরোক্ষভাবে উপস্থিত ছিলাম। আপনার আন্তরিকতা বরাবরের মত সদয় ও প্রাণময় ছিল। এই দেশকে নিঃস্বার্থ ভাবে ভালোবাসার প্রমাণ পেয়েছি বারবার। বর্তমানে এই করোনা সংকট নিয়ে আপনি ভীষণভাবে চিন্তিত জানি। এই দেশটির কল্যাণের জন্য যা করছেন সেটা অচিন্তনীয়। প্রতিটি মুহূর্ত আপনি খোঁজ রাখছেন এই দেশের হতভাগারা কেমন আছে। সেই খোঁজ খবরের অংশ হিসেবে রাজবাড়ী জেলাতেও খোঁজ নিলেন। এবং সব ভালো জেনে আপনি নিশ্চিন্তও হয়েছেন। কিন্তু আমরা সাধারনেরা নিশ্চিন্ত হতে পারিনি। কারণ সর্বহারাদের হাহাকার ভেসে আসে অনবরত।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আমরা সাধারণ মানুষ খুশি হতে পারিনি। কারণ প্রতি মুহূর্তে খবর পাই রাজবাড়ীর খেটে খাওয়া মানুষের না খাওয়ার আর্তনাদ!
দিন এনে দিন খাওয়া মানুষদের ৫/১০ কেজি চাল, কিছু পরিমাণ তেল এবং অন্যান্য দ্রব্যাদী দিয়ে সাতদিনও চলেনা। সবাই তীর্থের কাকের মত বসে থাকে কখন তারা সাহায্য পাবে। না পেলে লক ডাউনের ভিতরেও কাজ খোঁজার জন্য বেড়িয়ে পড়ে। এই সংখ্যাটা অনেক বেশি। যারা মানুষের বাসায় কাজ করে খাবার পেতো তারা আর বাসায় কাজ করতে পারছে না। ফলে তারা প্রায় অনাহারে দিন কাটাচ্ছে। কোথায় সাহায্য পাওয়া যায় তারা তা বারবার জানতে চায়।

এসবও আমি আজ বলতে চাইনি। এই জেলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে বলতে চাই। রাজবাড়ীর সদর হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারিরা সাত মাস যাবত বেতন পান না এমনটাই জেনেছি। আমি নিজে কয়েকমাস পূর্বে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলাম। শ্বাসকষ্ট এবং ক্যান্সারের রুগী আমি। সরকারী ডাক্তার লিখে দেবার পরও ভর্তি হতে জরুরী বিভাগের গরিমসিতে প্রাণ আমার যায় যায় অবস্থা। তিন তলায় হেঁটে উঠতে জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। আমার আপনজনেরা কোলে করে তিনতলায় উঠিয়ে দিশেহারা। এক রুগী নেমে যেয়ে আমাকে বেডটা দেন। এবার অক্সিজেন কোথায় পাবে? একজনের কাছ থেকে অক্সিজেন খুলে এনে নল না পাল্টিয়ে আমাকে দেওয়া হলো।
আর বাথরুমের যে দশা তা বর্ণনার ভাষা আমার নেই। নোংরা, ময়লা কাদায় ভরপুর। হাসপাতাল থেকে কোনো ঔষধ পাওয়া হয়না। কয়েকটা ইনজেকশন কিনে আমাকে দেওয়ার পর আমার পরিবার ঢাকায় নিয়ে এল। কোনো ডাক্তার নার্সকে দোষ দেই না। তারা কি করবে?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটা জেলা শহরের হাসপাতালের শ্রী যদি এই হয় তাহলে সেখানে করোনা রুগী বাঁচবে কি করে? চারপাশে দুর্গন্ধ, রুগী, অভিভাবকদের ঠাসা ঠাসিতে পরিপূর্ণ একটি হাসপাতাল। এরই মাঝে খাওয়া দাওয়া, কথা বার্তা। একটা অস্বাস্থকর নোংরা পরিবেশ! এটাকে কি হাসপাতাল বলা যায়?

যদিও ভিডিও কনফারেন্সের বিষয় ছিল রাজবাড়ীর করোনা বিষয়। যে হাসপাতালে রুগীদের অস্বাস্থকর পরিবেশে সেবা চলে সেখানে একজন করোনা রুগীর জন্য আপনার কাছে কি কিছুই বলার ছিলনা? দুই একটি ভেন্টিলেটর, প্রয়োজনীয় অক্সিজেন ব্যবস্থা, ডাক্তার নার্সদের সুরক্ষিত পোষাক, পরিচ্ছন্নতার জন্য যাবতীয় সরঞ্জাম কি উপস্থিত নেতারা কি আপনার কাছে বলতে পারত না ? কেন রুগীর সঙ্কটাপূর্ণ মুহূর্তে ঢাকায় পাঠাতে হবে? নিজেদের সেই ব্যবস্থা রাখার জন্য কিছু আয়োজন থাকবে না কেন? সিভিল সার্জন কেন কিছু বললেন না? তারই তো কথা বলবার দরকার ছিল?

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
আপনি তো জনগণের ভালো চান। আমি যতটুকু আপনাকে বললাম এ দৃশ্য দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছবি। এমনটাই হচ্ছে। আমি এ-ও জানি, আপনার একার পক্ষে সবটা সামলানো কঠিন। আমাদের বঙ্গবন্ধু তার নিজের কম্বলটি কোথায় জানতে চেয়েছিলেন। সেই অভ্যাস পাল্টায়নি। গরীবের এই সাহায্য বেশির ভাগ দেশে বিদেশে অট্টালিকা বানাতে কাজে লাগবে তাদের। এমন সুযোগ কি সবসময় পাওয়া যায়?
আমি জানি এই লেখা আপনার কাছে কখনো পৌছাবে না। যাদের মরার তারা মরবে। তারা তো এভাবেই মরে এসেছে। জন্মই তাদের আজন্ম পাপ।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
এই দেশের আমি একজন ক্ষুদ্র নাগরিক। সেই অধিকারেই বলছি আমি যদি করোনা আক্রান্ত হই তবে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে কখনই যাবনা। সেখানে যাওয়া নাযাওয়া একই কথা।
আপনি ভালো থাকুন। আপনি ভালো না থাকলে দেশ ভালো থাকবে না। চাটুকারের দল থেকে সাবধান থাকবেন। আমাদের বঙ্গবন্ধুর মত কাউকে বিশ্বাস করবেন না। সুযোগ পেলেই এরা ১৫ আগস্টের মত ঘটনা ঘটাবে। মহান আল্লাহ আপনাকে রক্ষা করুন। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

আতিকা বেগম রাশি
সজ্জন কান্দা
রাজবাড়ী।

Total View: 685

    আপনার মন্তব্য


[fbcomments]